দাঁত ও মাড়ির সুস্থতার জন্য অপরিহার্য একটি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলব: সেটি হলো স্কেলিং ও পলিশিং। অনেকেই এই পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন বা এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না। আজকে আমি আলোচনা করব স্কেলিং ও পলিশিং কী, কখন এটি করা প্রয়োজন, এবং স্কেলিং করার আগে ও পরে আপনার কী করা উচিত—সবই ক্লিনিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে।
স্কেলিং (Scaling) হলো দাঁত থেকে জমে থাকা প্লাক (plaque), ক্যালকুলাস (calculus) এবং মাড়ির নিচে লুকিয়ে থাকা ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করার একটি বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি। এই জমে থাকা জিনিসগুলো সাধারণ ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। একজন ডেন্টাল সার্জন বা পিরিয়ডনটিস্ট সাধারণত আল্ট্রাসনিক স্কেলার নামে একটি আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে এই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করে থাকেন। এই যন্ত্রটি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির কম্পনের মাধ্যমে দাঁতের উপর থেকে শক্ত আস্তরণগুলো ভেঙে দেয়।
আর পলিশিং (Polishing) হলো স্কেলিংয়ের পরের ধাপ। স্কেলিংয়ের পর দাঁতের উপরিভাগ কিছুটা অমসৃণ থাকতে পারে। পলিশিংয়ের মাধ্যমে দাঁতের উপরিভাগকে মসৃণ ও উজ্জ্বল করা হয়। এর ফলে ভবিষ্যতে দাঁতে দ্রুত ময়লা বা ব্যাকটেরিয়ার স্তর জমতে পারে না এবং দাঁত দেখতেও আরও সুন্দর ও পরিষ্কার লাগে।
এখন আসি, দাঁতের স্কেলিং কখন করা প্রয়োজন?
স্কেলিং সাধারণত আপনার নিয়মিত ডেন্টাল চেকআপেরই একটি অংশ। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্কেলিং বিশেষভাবে জরুরি হয়ে পড়ে:
দাঁতে শক্ত আস্তরণ: যদি আপনার দাঁতে শক্ত হলুদ বা বাদামি রঙের প্লাক বা ক্যালকুলাসের আস্তরণ জমে যায়, যা ব্রাশ করে ওঠে না।
মাড়ির প্রদাহ (Gingivitis): মাড়ি ফুলে যাওয়া, লালচে হয়ে যাওয়া, ব্রাশ করার সময় বা খাবার খাওয়ার সময় রক্ত পড়া অথবা মাড়িতে হালকা ব্যথা অনুভব করলে স্কেলিং প্রয়োজন। এটি মাড়ির রোগের প্রাথমিক লক্ষণ।
গভীর সংক্রমণ (Periodontitis): যদি মাড়ি থেকে পুঁজ বের হয়, মুখে দুর্গন্ধ থাকে, অথবা দাঁত নড়বড়ে মনে হয়, তবে এটি মাড়ির রোগের আরও গুরুতর অবস্থা (পিরিয়ডোন্টাইটিস) নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে স্কেলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অপারেশন বা চিকিৎসার আগে: দাঁতে কোনো বড় চিকিৎসা যেমন: ফিলিং, রুট ক্যানাল, ইমপ্লান্ট বসানো বা অন্য কোনো দাঁতের অস্ত্রোপচারের আগে মুখ ও মাড়ি সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য স্কেলিং আবশ্যক।
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ: সাধারণ সুস্থতার জন্য, একজন ডেন্টিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী বছরে অন্তত ১-২ বার স্কেলিং করানো উচিত। এটি মুখের স্বাস্থ্যকে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
স্কেলিং একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া হলেও, এর আগে ও পরে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি:
স্কেলিংয়ের আগে:
চিকিৎসকের সাথে আলোচনা: স্কেলিং শুরু করার আগে আপনার ডেন্টিস্টকে আপনার সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত তথ্য জানান। বিশেষ করে যদি আপনার রক্তক্ষরণজনিত কোনো সমস্যা (যেমন: হিমোফিলিয়া), ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ (যেমন: কৃত্রিম ভালভ বা হার্টে স্টেন্ট লাগানো থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রোফাইল্যাক্সিসের প্রয়োজন হতে পারে) থাকে।
অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা: আপনি যদি গর্ভবতী হন বা কোনো ঔষধ সেবন করেন (যেমন: রক্ত পাতলা করার ঔষধ) অথবা কোনো নির্দিষ্ট কিছুতে অ্যালার্জি থাকে, তাহলে অবশ্যই তা চিকিৎসককে অবহিত করুন।
স্কেলিংয়ের পরে:
খাবার নিয়ন্ত্রণ: প্রথম ২৪ ঘণ্টা গরম, ঝাল বা খুব শক্ত খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ এই সময় মাড়ি কিছুটা সংবেদনশীল থাকতে পারে।
মুখ পরিষ্কার রাখা: হালকা গরম লবণ পানি দিয়ে দিনে ২-৩ বার কুলি করুন। এটি মাড়ির প্রদাহ কমাতে সাহায্য করবে।
নিয়মিত ব্রাশ ও ফ্লসিং: নরম টুথব্রাশ ব্যবহার করে আলতোভাবে ব্রাশ করুন। দাঁত স্কেলিং হয়েছে মানে এই নয় যে আপনাকে ব্রাশ করা বন্ধ করতে হবে; বরং এখন আরও ভালোভাবে ব্রাশ ও ফ্লস করা উচিত।
রঙিন খাবার ও পানীয়: স্কেলিংয়ের পর দাঁত কিছুটা সংবেদনশীল এবং পলিশিংয়ের কারণে মসৃণ হয়। তাই পরের ৪৮ ঘণ্টা ধূমপান, চা-কফি বা অন্য কোনো রঙযুক্ত খাবার বা পানীয় এড়িয়ে চলুন, যাতে দাঁতে নতুন করে দাগ না পড়ে।
মাউথওয়াশ: আপনার ডেন্টিস্ট যদি কোনো অ্যান্টিসেপটিক মাউথওয়াশ ব্যবহারের পরামর্শ দেন, তবে নিয়মিত সেটি ব্যবহার করুন।
মনে রাখবেন, বছরে অন্তত একবার ডেন্টাল চেকআপ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্কেলিং ও পলিশিং করানো আপনার মুখের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখে। ছোট সমস্যাকে বড় হতে না দিয়ে সময় মতো চিকিৎসা নিলে ব্যথা, সময় এবং অর্থ—সবই বাঁচবে।
নিয়মিত স্কেলিং ও পলিশিং এবং সঠিক পরিচর্যা কেবল একটি সুন্দর হাসিই নয়, এটি আপনার দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি! সুস্থ থাকুন, হাসিখুশি থাকুন।
Tooth Gap Correction
Orthodontic Braces Tretment
Root Canel & Cap
Dental Implant
Filling
Scaling & Polishing
© 2023 Redesign and Development by Medibot